গত শুক্রবার মার্কিন নন-ফার্ম পেরোল (NFP) প্রতিবেদন প্রকাশের পর ইউরো ও পাউন্ড স্টার্লিং দ্রুতই দরপতনের শিকার হয়, তবে আজ সেই নিম্নমুখী প্রবণতার পুরোপুরিভাবে সমাপ্তি ঘটেছে। কারেন্সি দুটির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক মনে হলেও, আমি এখনই প্রবণতা পরিবর্তনের ঘোষণা দেব না; কারণ মার্কিন ডলারের ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি গত সপ্তাহে প্রকাশিত নন-ফার্ম পেরোল (NFP) প্রতিবেদন নয়, বরং এই সপ্তাহেরই অন্য একটি ঘটনা মূল ভূমিকা পালন করেছে।
ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিসটিক্সের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পে-রোল (কৃষি-বহির্ভূত কর্মসংস্থান) 162,000 বৃদ্ধি পেয়েছে—যেখানে বৃদ্ধির প্রত্যাশা ছিল প্রায় 55,000—এবং বেকারত্বের হার 4.1%-এ অপরিবর্তিত রয়েছে। পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি এই ফলাফলই মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করার জন্য যথেষ্ট ছিল; এর ফলে মার্কিন ডলারের দর বৃদ্ধি পেয়েছে ও ফেডারেল রিজার্ভের হকিশ বা কঠোর মুদ্রানীতি-সমর্থক গোষ্ঠী বাড়তি সুবিধা পেয়েছে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসেট এবং যারা দ্রুত নীতিমালা নমনীয়করণের প্রত্যাশায় পজিশন ওপেন করেছিলেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মূল প্রতিবেদনটির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আগের মাসগুলোর প্রতিবেদনে আনা সংশোধনী। জুলাই মাসের ফলাফল 11,000 এবং জুন মাসের সংখ্যাটি 44,000 বাড়িয়ে সংশোধন করা হয়েছে; এর ফলে জুলাইয়ের -23,000-এর ফলাফল +21,000-এ পরিণত হয়েছে এবং এই দুই মাসে মোট কর্মসংস্থানের পরিমাণ আগের প্রকাশিত হিসাবের চেয়ে প্রায় 55,000 বেশি দাঁড়িয়েছে। অন্য কথায়, শ্রমবাজারের যে অবনতির কারণে ফেডের আর্থিক নীতিমালা নমনীয় হওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি; ফলে ফেডারেল রিজার্ভের পক্ষে নমনীয় বা ডোভিশ অবস্থানে ফিরে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা আর অবশিষ্ট নেই। মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতির কারণে আর্থিক নীতিমালায় এমন কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, এবং সেপ্টেম্বরে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা আবারও বেড়ে গেছে, যা মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও প্রায় বাতিল বলে মনে হয়েছিল।
কর্মসংস্থান বিষয়ক প্রধান সূচকগুলো যখন ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন ট্রেডাররা কেন মুদ্রানীতি কঠোর হওয়ার (সুদের হার বৃদ্ধির) বিষয়টি ধরে নিয়ে এগোচ্ছে? এর কারণ হলো, নীতিনির্ধারকরা এখনও ওই সূচকগুলোর ওপর খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।ISM পরিষেবা খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সূচকটি এখনও সংকোচনমূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং উৎপাদন খাতভিত্তিক সূচকেও কর্মসংস্থান হ্রাসের চিত্র দেখা যাচ্ছে—কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সংখ্যা 162,000 হওয়ায়, সুদের হার নির্ধারণকারী কমিটির কাছে ওই সূচকগুলোর গুরুত্ব কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, জুলাই মাসের বৈঠকে ৯-৩ ভোটে 'ফান্ডস রেট' বা সুদের হার 3.50–3.75%-এর মধ্যে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং যারা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন তারা সুদের হার বাড়ানোর পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন; শুক্রবারের তথ্য সেই তিন সদস্যের গোষ্ঠীকে তাদের কাঙ্ক্ষিত যুক্তিটিই জোগাল। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পরিষেবা খাতের কোম্পানিগুলো, যেখানে কর্মী নিয়োগের হার ইতোমধ্যেই সংকুচিত হচ্ছে; আর সামগ্রিক অর্থনীতিকে এর মূল্য দিতে হবে ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
সবশেষে ১১ই সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে এবং পুরো সপ্তাহজুড়ে ট্রেডাররা এই প্রতিবেদনের জন্য প্রস্তুতি নেবেন। ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত হলে সেপ্টেম্বরে সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাবে এবং ইউরো ও পাউন্ড স্টার্লিংয়ের বিপরীতে ডলারের দর আরও বেড়ে যাবে; অন্যদিকে, এই হার কমে গেলে বা মন্থর হয়ে গেলে নীতিনির্ধারক কমিটির অভ্যন্তরীণ বিতর্কের মোড় ঘুরে যাবে এবং শুক্রবার মার্কিন ডলারের দর বৃদ্ধির বিষয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুত মিলিয়ে যাবে। ওই প্রতিবেদন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কেটে মার্কিন ডলারভিত্তিক বড় ধরনের 'লং পজিশন' ওপেন করা হবে বলে আমার মনে হয় না—আর এ কারণেই আজ মার্কেটে বেশ মন্থর মুভমেন্ট দেখা যাচ্ছে।
তবে ইউরোর ক্ষেত্রেও নিজস্ব কিছু যুক্তি রয়েছে। এই সপ্তাহে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং বৈঠকটিতে সুদের হার বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। জুলাই মাসে উক্ত অঞ্চলের প্রডিউসার প্রাইস বা উতপাদক মূল্য সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় 5.8% বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তৈরি হয়েছে—কারণ এ ধরনের উচ্চমাত্রার ব্যয়ের চাপ অনিবার্যভাবেই শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। সুদের হারের এই ব্যবধান বেড়ে যাওয়ার ফলে ইউরো হোল্ডার বিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারেন; অন্যদিকে ইউরোপীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের একই সাথে জ্বালানি ও অর্থ—উভয়ের জন্যই উচ্চমূল্যের বোঝা বহন করতে হয়। সুতরাং, শুক্রবারের ব্যাপক দরপতনের পর ইউরোর ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
আজকের অর্থনৈতিক সূচকের তালিকা সেই যৌক্তিকতাকে দুর্বল করতে পারবে না বলেই মনে হচ্ছে। জার্মানিতে জুলাই মাসের শিল্প উৎপাদন সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে; পূর্বাভাস অনুযায়ী, মে মাসে শিল্প উৎপাদন +0.7% এবং জুন মাসে +0.2% বৃদ্ধির পর এবার তা 0.1% বৃদ্ধি পেতে পারে। এই প্রবণতা ইঙ্গিত দেয় যে জার্মানির শিল্প খাত ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হলে তা জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। এছাড়া ইউরোজোনে দ্বিতীয় প্রান্তিকের জিডিপির দ্বিতীয় প্রাক্কলন প্রকাশিত হবে, যেখানে প্রান্তিক ভিত্তিতে +0.4% এবং বার্ষিক ভিত্তিতে +1.0% প্রবৃদ্ধি অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে; পাশাপাশি কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতিবেদনেও প্রান্তিক ভিত্তিতে +0.1% এবং বার্ষিক ভিত্তিতে +0.5% পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য আরেকটি প্রতিবেদন হলো সেপ্টেম্বর মাসের সেনটিক্স বিনিয়োগকারী-আস্থা সূচক (সর্বসম্মত পূর্বাভাস 2.1); কারণ সূচকটিতে যদি প্রত্যাশার চেয়ে ইতিবাচক কোনো ফলাফল দেখা যায়, তবে তা ইউরোর মূল্যকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করতে পারে।
টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ
EUR/USD
ঘণ্টাভিত্তিক চার্টে, আমি এই পেয়ারের মূল্য 1.1601 এবং 1.1587-এর কাছাকাছি থাকা অবস্থায় বাই পজিশন ওপেন করার কথা বিবেচনা করব যদি সেখানে কোনো 'ফলস ব্রেকআউট' ঘটে অথবা ওই লেভেলগুলোর নিচে ক্লোজিং বা অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থতার লক্ষণ দেখা যায়। বুলিশ বা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রাখার জন্য বুল বা ক্রেতাদের (bulls) মূল কাজ হলো এই পেয়ারের মূল্যকে 1.1621-এর উপরে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে মূল্যকে বজায় ধরে রাখা; এই রেঞ্জের বাইরে কনসলিডেশন এবং ব্রেকআউট ঘটলে এই পেয়ারের মূল্যের 1.1641 এবং 1.1657-এর দিকে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে, যেখানে ১৫–২০ পিপস মূল্য বৃদ্ধির প্রত্যাশায় সেলিং স্ট্র্যাটেজি অবলম্বন করাটা অধিক যৌক্তিক হবে। এই পেয়ারের মূল্য 1.1657-এর নতুন উচ্চতায় পৌছালে ২রা সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বুলিশ প্রবণতা অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হবে।1.1621-এর লেভেলের ফলস ব্রেকআউটের ক্ষেত্রে বিয়ারিশ বা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যেতে পারে; আমি কেবল 1.1568 থেকে পুলব্যাকের সময় এই পেয়ারের বাই পজিশন ওপেন করার কথা বিবেচনা করব এবং এক্ষেত্রেও ১৫–২০ পিপস মুভমেন্টের প্রত্যাশা করা যেতে পারে।
GBP/USD
এই পেয়ারের পরিস্থিতি বেশ জটিল। ইউরো কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হলেও, GBP/USD-এর মূল্য 1.3545-এর লেভেলে থমকে গেছে এবং একটি 'সাইডওয়েজ চ্যানেল' মধ্যে আটকে আছে; যার লোয়ার বাউন্ডারি 1.3480 এবং মধ্যবর্তী লেভেলগুলো 1.3501 ও 1.3521-এ অবস্থিত। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সময়, 1.3521-এর উপরে একটি ফলস ব্রেকআউট দেখা দিলে তা 1.3501-এর দিকে সেল পজিশন ওপেন করার সুযোগ তৈরি করতে পারে; এই পেয়ারের মূল্য এই লেভেলের নিচে নেমে গিয়ে অবস্থান ধরে রাখলে তা 1.3480-এর (গত সপ্তাহের সর্বনিম্ন লেভেল) দিকে পুনরায় দরপতন ঘটাতে পারে। আর যদি এই রেঞ্জের নিচে বড় ধরনের দরপতন (রেঞ্জের ব্রেকডাউন) ঘটে, তবে 1.3457-এর দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত হবে—যেখানে আমি ২০-২৫ পিপসের একটি রিবাউন্ডের প্রত্যাশায় বাই পজিশন ওপেন করার সুযোগ খুঁজব। 1.3501 এবং 1.3480 লেভেল থেকে লং পজিশন ওপেন করা তখনই যুক্তিযুক্ত হবে যদি ওই লেভেলগুলোতে 'ফলস ব্রেকআউট' দেখা যায়; যদি বিয়ার বা বিক্রেতারা 1.3521-এর বাধা অতিক্রম করাতে ব্যর্থ হয়, তবে ক্রেতারা এই পেয়ারের মূল্যকে 1.3545 পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে—যেখানে ওই উচ্চতায় অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে অথবা 1.3573 থেকে বাউন্সের সুযোগ কাজে লাগিয়ে শর্ট পজিশন ওপেন করা যেতে পারে।
আমার ধারণা, শুক্রবার মার্কিন ডলারের মূল্যের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে, তা বজায় থাকার সুযোগ বেশ সীমিত। নন ফার্ম পেরোল প্রতিবেদনের প্রভাব ইতোমধ্যেই মার্কেটে প্রতিফলিত হয়ে গেছে; পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দিন হচ্ছে ১১ই সেপ্টেম্বর। তাছাড়া, এই সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠকটি EUR/USD-এর ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের প্রতিকূলে কাজ করবে। তাই, আগামী সেশনগুলোতে EUR/USD পেয়ারের মূল্য একটি নির্দিষ্ট রেঞ্জের মধ্যে কনসলিডেশনের পাশাপাশি সেই রেঞ্জের উপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করবে বলে আমি মনে করি। পাউন্ড সম্ভবত ইউরোর তুলনায় দুর্বলই থাকবে এবং GBP-এর ওপর চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ এই সপ্তাহে ব্রিটিশ পাউন্ডের নিজস্ব কোনো মৌলিক চালিকাশক্তি নেই।
*এখানে পোস্ট করা মার্কেট বিশ্লেষণ আপনার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রদান করা হয়, ট্রেড করার নির্দেশনা প্রদানের জন্য প্রদান করা হয় না।
ইন্সটাফরেক্স বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনাগুলো আপনাকে মার্কেট প্রবণতা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন করবে! ইন্সটাফরেক্সের একজন গ্রাহক হওয়ায়, দক্ষ ট্রেডিং এর জন্য আপনাকে অনেক সেবা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।